অর্থনীতি ও অপরাধ প্রতিবেদক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের বিপুল অর্থ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পকেটে ঢোকানোর এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক অডিট রিপোর্টে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
অডিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত ১০ বছরে দেশের ২৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল, শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এবং সূচনা ফাউন্ডেশনসহ শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দলীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর (CSR) ব্যয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ।
ফরেনসিক অডিটে দেখা যায়, ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রত্যক্ষ চাপ ও রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই অর্থ লুট করা হয়। ওই ১০ বছরে বিএবি সরাসরি সদস্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১০৫ কোটি টাকা জোরপূর্বক চাঁদা হিসেবে সংগ্রহ করে বিভিন্ন দলীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠায়।
বাকি ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা বিএবির পাঠানো বাধ্যতামূলক ‘অনুরোধপত্রের’ ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে জমা দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া অডিটররা আরও ৫৬৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন, যা একই ধরণের পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছিল।
ফরেনসিক অডিটের নথিপত্র অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর সামাজিক কল্যাণের টাকা যেভাবে শেখ হাসিনার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে ভাগাভাগি হয়েছে:
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল: দেশের বন্যা মোকাবিলা, ত্রাণ ও শিক্ষা সহায়তার নামে এই রাষ্ট্রীয় তহবিলে নেওয়া হয়েছে ১,১১১ কোটি টাকা।
শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট: এই ট্রাস্টে সরাসরি অনুদান দেওয়া হয় ৩৭৪ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা নিজেই এই ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ছিলেন। এই অর্থের প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী বা ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের নামে।
সূচনা ফাউন্ডেশন: শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি সিএসআর তহবিল থেকে পেয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। এছাড়া বিএবির সদস্য ব্যাংকগুলোকে অবৈধভাবে চাপ দিয়ে সূচনা ফাউন্ডেশনের ব্যাংক হিসাবে আরও ৩৩ কোটি ৫ লাখ টাকা জমা করানোর অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
ক্রীড়া ও চলচ্চিত্র স্পন্সর: অডিট অনুযায়ী, কেবল মুজিববর্ষ উদযাপনের মেগা আয়োজনের জন্যই ব্যাংকগুলো থেকে ১৭৩ কোটি টাকা তোলা হয়েছিল। এর বাইরে আরও ৭৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ওপর নির্মিত একটি বিতর্কিত চলচ্চিত্রের স্পন্সরশিপ এবং রাজনৈতিক ক্রীড়া আয়োজনে।
অন্যান্য খাত: সিএসআর-এর বাকি অর্থ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের নাম ভাঙিয়ে বিতরণ করা হয়।
ফরেনসিক অডিটররা গত এক দশকে ৫৩৩ কোটি টাকার সম্পূর্ণ সন্দেহজনক লেনদেন ও ব্যয়ের তথ্য পেয়েছেন। এসব ব্যয়কে অডিট রিপোর্টে ‘অযোগ্য’ বা ‘সমর্থনহীন’ (Unvouched) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এগুলোর সঙ্গে কোনো ব্যাংকিং বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি এবং এগুলোর কোনো বৈধ ভাউচার বা নথিপত্র নেই।
এর মধ্যে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকার অনুদানের তথ্য সদস্য ব্যাংকগুলো তাদের খাতায় দেখালেও তার পক্ষে কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেনি। এছাড়া ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার অনুদানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা ব্যাংকিং রসিদ নেই। নগদ (Cash) অনুদান দেওয়া হয়েছে ৯৯ লাখ টাকা এবং অস্তিত্বহীন ও ভুয়া সরবরাহকারীর কাছ থেকে কোনো দরপত্র ছাড়াই ৭৬ লাখ টাকার কেনাকাটা দেখানো হয়েছে। সমাপনী ব্যাংক হিসাবেও ১৪ লাখ টাকা কম দেখানোর মতো জালিয়াতি ধরা পড়েছে।
অডিটে অত্যন্ত জঘন্য দুটি জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। কোনো রূপ অনুমোদন ছাড়াই ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এক খাত থেকে অন্য খাতে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ঘটনা: আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধপীড়িত ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তার নামে ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তোলা হয়েছিল। কিন্তু সেই ত্রাণের অর্থ ফিলিস্তিনে না পাঠিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবে দেশের একটি অটিস্টিক শিশুদের বিশেষায়িত স্কুলে স্থানান্তর করা হয়।
দ্বিতীয় ঘটনা: সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে রাষ্ট্রীয় এক আয়োজনে সহায়তার কথা বলে বিএবির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ তোলা হয়। কিন্তু অডিটররা রেকর্ড ঘেঁটে দেখেছেন, সেই অর্থের মধ্য থেকে সরাসরি ১ কোটি টাকা তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ‘অ্যাকাউন্ট-পেয়ী’ চেকের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল।
বর্তমান সরকারের নির্দেশে এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ফরেনসিক অডিট রিপোর্টটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও বিএবির তৎকালীন নীতি নির্ধারকদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |